‘মাতৃরূপা কুমারী পূজা’ জেন নিন ইতিবৃত্ত

নিউজ দুনিয়া ২৪, ওয়েব ডেস্ক:৫ বছর বয়স থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত অজাতপুষ্পবালাকে কুমারী বলে।
বিশেষত দুর্গাপূজার অঙ্গরূপে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।এছাড়াও কালীপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা এবং অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে এবং কামাখ্যাদি শক্তিক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে।বর্তমানে কুমারী পূজার প্রচলন কমে গেছে।প্রতিবছর দুর্গাপূজার মহাষ্টমী পূজার শেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয় তবে মতান্তরে নবমী পূজার দিনও এ পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে।

পৌরাণিক মতে কুমারী পূজার উদ্ভব হয় কোলাসুরকে বধ করার মধ্য দিয়ে থেকে।গল্পে বর্ণিত রয়েছে, কোলাসুর এক সময় স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করায় বাকি বিপন্ন দেবগণ মহামায়ার শরণাপন্ন হন।সে সকল দেবগণের আবেদনে সাড়া দিযে় দেবী পুনর্জন্মে কুমারী রূপে কোলাসুরকে বধ করেন।এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়।

যোগিনীতন্য, কুলার্ণবতন্য, দেবীপুরাণ, স্তোত্র, কবচ, সহস্রনাম, তন্যসার, প্রাণতোষিণী,পুরোহিতদর্পণ প্রভৃতি ধর্মীয় গ্রন্থে কুমারী পূজার পদ্ধতি এবং মাহাত্ম্য বিশদভাবে বর্ণিত হযে়ছে।বর্ণনানুসারে কুমারী পূজায় কোন জাতি,ধর্ম বা বর্ণভেদ নেই।দেবীজ্ঞানে যে-কোন কুমারীই পূজনীয়,এমনকি বেশ্যা কুলজাত কুমারীও। তবে সাধারণত ব্রাহ্মণ কুমারী কন্যার পূজাই সর্বত্র প্রচলিত।এক্ষেত্রে এক থেকে ষোলো বছর বয়সী যে কোনো কুমারী মেযে়র পূজা করা যায়।বয়সের ক্রমানুসারে পূজাকালে এই সকল কুমারীদের বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়।

এক বছরের কন্যা — সন্ধ্যা
দুই বছরের কন্যা — সরস্বতী
তিন বছরের কন্যা — ত্রিধামূর্তি
চার বছরের কন্যা — কালিকা
পাঁচ বছরের কন্যা — সুভগা
ছয় বছরের কন্যা — উমা
সাত বছরের কন্যা — মালিনী
আট বছরের কন্যা — কুষ্ঠিকা
নয় বছরের কন্যা — কালসন্দর্ভা
দশ বছরের কন্যা — অপরাজিতা
এগারো বছরের কন্যা — রূদ্রাণী
বারো বছরের কন্যা — ভৈরবী
তেরো বছরের কন্যা — মহালপ্তী
চৌদ্দ বছরের কন্যা — পীঠনাযি়কা
পনেরো বছরের কন্যা — ক্ষেত্রজ্ঞা
ষোলো বছরের কন্যা — অন্নদা বা অম্বিকা

কুমারী পূজার দার্শনিক তত্ত্ব হলো নারীতে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন।বিশব ব্রহ্মাণ্ডে যে ত্রিশক্তির বলে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় ক্রিয়া সাধিত হচ্ছে,সেই ত্রিবিধ শক্তিই বীজাকারে কুমারীতে নিহিত।কুমারী প্রকৃতি বা নারী জাতির প্রতীক ও বীজাবস্থা।তাই কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপ করে তার সাধনা করা হয়।এ সাধন পদ্ধতি তে সাধকের নিকট বিশ্বজননী কুমারী নারীমূর্তির রূপ ধারণ করে; তাই তার নিকট নারী ভোগ্যা নয়,পূজ্যা।পৌরাণিক কল্পকাহিনিতে বর্ণিত আছে,এ ভাবনায় ভাবিত হওয়ার মাধ্যমে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন।

শান্ত, পবিত্র, সর্তশীলা এসব দৈবী সম্পদের
অধিকারিণী কুমারীই জগজ্জননীর প্রতিমারূপে গ্রহণে বিধান আছে। ব্রহ্ম ও শক্তি অভিন্ন। যাঁকে ঈশ্বর, হরি, গড প্রভৃতি বলা হয়, তাঁকে মাতৃভাবে সাধনার সময় বলা হয় জগজ্জননী। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানবজাতির ক্ষেত্রে মায়ের নীরব অবদানের ঋণ পরিশোধ করা অসম্ভব।
নারী শক্তিরূপিণী। তাঁর সঠিক মূল্যায়নের অভাবে আমাদের অবক্ষয়
নেমে আসে। আবার তাঁর উপযুক্ত মর্যাদায় সমাজ হয় কল্যাণমুখী।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন
— ‘মেয়েদের পূজা করেই সব জাত বড় হয়েছে। যে দেশে, যে জাতে মেয়েদের পূজা নেই, সে দেশ, সে জাত কখনও বড় হতে পারেনি,
কস্মিন্কালেও পারবে না।
মনু বলেছেন,
‘যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতা:।
যত্রৈতাস্তু ন পূজ্যতে সর্বাস্তত্রাফলা : ক্রিয়া:।’ অর্থাত্,
যেখানে নারীগণ পূজিতা হন, সেখানে দেবতারা প্রজসন্ন। যেখানে নারীগণ সম্মানিতা হন না,
সেখানে সকল কাজই নিষ্ফল। (মনুসংহিতা, ৩.৫৬)
যেখানে স্ত্রীলোকের আদর নেই, স্ত্রীলোকেরা নিরানন্দে অবস্থান করে, সে সংসারের, সে দেশের কখনও উন্নতির আশা নেই।’ মাটির প্রতিমায় যে দেবীর পূজা করা হয়, তারই বাস্তব রূপ কুমারী পূজা।
কুমারীতে সমগ্র মাতৃজাতির শ্রেষ্ঠ শক্তি—পবিত্রতা, সৃজনী ও পালনী শক্তি, সকল কল্যাণী শক্তি সূক্ষ্মরূপে…
তাই কুমারী পূজা। কুমারী প্রতীকে আমাদের মাতৃরূপে অবস্থিত।
সর্বব্যাপী ঈশ্বরেরই মাতৃভাবে আরাধনা। যে জাতির মধ্যে শুদ্ধা, শিক্ষিতা, করুণাময়ী মায়ের সংখ্যা বেশি সে মাতৃজাতির সন্তানেরা সমাজের আদর্শ সন্তান। নিজ নিজ শক্তির বিকাশের জন্য সমগ্র নারী জাতির প্রতি প্রয়োজন নিজের মায়ের শ্রদ্ধা। তাই কুমারী পূজার মাধ্যমে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ শ্রদ্ধা জানায়।সবাইকে জানাই মহাষ্টমী পূজার মাতৃময় প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

দেবী প্রপন্নার্তি হরে প্রসীদ।
প্রসীদ মাতর্জগতহখিলস্য।।
প্রসীদ বিশ্বেশ্বরী পাহি বিশ্বম।
ত্বমিশ্বরী দেবী চরাচরস্য।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *